Thursday, August 5, 2010

আমার শিক্ষক শহীদ অধ্যাপক হবিবুর রহমান

-সুব্রত মজুমদার

১৯৬০ থেকে ১৯৬২, এই দুই বছর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে M.Sc ক্লাসে ছাত্র থাকার সময় হবিবুর রহমান সাহেব আমার শিক্ষক ছিলেন| ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাস থেকে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত তাঁকে আমি সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি | এই সময় তাঁকে কাছ থেকে দেখতে পারার এবং গণিত বিষয়ে শিক্ষকতা, অধ্যয়ন ও গবেষণায় তাঁর নিরলস আত্মনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার প্রয়াসের অঙ্গ হিসেবে, এক দিকে ক্রীড়া-সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনে বিচরণ, অন্য দিকে সামাজিক দায়িত্ব-পালনে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে চিত্তের প্রসার ও মহত্ত্ব-অর্জনের প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে | আমি যদি সামান্য কিছু গণিত শিখতে পেরে থাকি, গণিত যদি আমার হৃদয়ের ধন হয়ে থাকে, এবং যদি আমি মনুষ্যত্ব-লাভের সামান্য পাঠ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়ে থাকি, তাহলে তার অন্যতম কারণ, এই মহান ব্যক্তিত্বের সস্নেহ সান্নিধ্য-লাভ |

সংক্ষেপে তাঁর বিষয়ে কিছু লিখব |

হবিবুর রহমান সাহেবের স্কুল ও জীবনের পরীক্ষাগুলি অত্যুজ্জ্বল কৃতিত্বের সাক্ষ্য বহন করে | ব্রিটিশ আমলের প্রায় শেষ প্রান্তে তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে M.Sc পাশ করেন | আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের একটি অনন্য-উজ্জ্বল দিক আছে | যদিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ছাত্র-গবেষক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ছাত্র-শিক্ষক-গবেষক সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা বিশ্ববিখ্যাত, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রামানুজনের মত বিশ্বের সর্বকালীন বিস্ময়কর গণিত-প্রতিভা গবেষণা করেছেন, লাহোরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের ছাত্র-শিক্ষক-গবেষক আব্দুস সালাম নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তবু আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শুরুর দিকে বিশ্বের সর্বকালীন শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের একজন বিভাগের প্রধান হিসেবে, কর্ণধার হিসেবে ছিলেন বলে এই বিভাগ প্রথম থেকেই বিশ্বমানের আস্বাদন পেয়েছিল, যা সম্ভবত অন্যত্র ঘটেনি | এই গণিতবিদ আঁদ্রে ওয়াইল (Andre Weil) | গত শতাব্দীর শেষ দিকে তাঁর মৃত্যু হয় | প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Ph. D. করে এই উপমহাদেশে এসে অত্যন্ত অল্প বয়সেই মহা পন্ডিত এই ফরাসী নবীন যুবা কঠোর হাতে প্রকৃত জ্ঞানী ও মেধাবীদের সমাবেশ ঘটিয়ে গণিত বিভাগ গড়ে তোলেন |

আঁদ্রে ওয়াইল-এর অসাধারনত্ব নিয়ে দু-একটি কথা বলা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবেনা | খুব অল্প বয়েসে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়তে ঢুকে, উনি প্রথম বছরেই অনার্সের সম্পূর্ণ পাঠ্য-সূচী নিজে পড়ে ফেলেন | এছাড়া, উনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ রীমান (Reimann) - এর সবকটি গবেষণা-পত্রও ওই বছর নিজে পড়ে ফেলেন | অনার্স পাশ করার পর বয়স কম থাকে ওঁকে Ph. D.-র কাজ শুরু করতে দেয়া হয়নি | এক বছর ইতালিতে ও জার্মানির Gottingen-এ পন্ডিতদের সাহচর্যে থেকে তারপর প্যারিসে এসে Ph. D. থিসিস রচনা করেন | তাঁর Ph. D. থিসিসের পরীক্ষক নির্ধারণ করার দায়িত্ব প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকেই দেন!

ইস্কুলে ঢোকার আগে দু-এক মাস সময় হাতে পাওয়ায় আঁদ্রে ওয়াইল সংস্কৃত শিখে ফেলেন | এত অল্প সময়ে কিন্তু তিনি শুধু ভাষা নয়, সাহিত্য-ও পড়ে ফেলেন | কালিদাসের কাব্যের কিছু কিছু অংশ অনেক কাল পরেও তাঁর মুখস্থ ছিল | সম্ভবত এই পটভূমির কারণে বিখ্যাত ফরাসী ভারত-তত্ত্ববিদ (Indologist) Sylvan Levi তাঁকে ভারতে অধ্যাপনা করতে যেতে বলেন | তাঁর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার এই পটভূমি |

রহমান সাহেবের গণিত-স্পৃহা ও গণিত-অনুসন্ধিত্সার সুচনা সম্ভবত আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়েই রচিত হয় | এছাড়া, চাকরি জীবনের প্রথমেই কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা এই সূচনাকে দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব দিয়েছে | কারণ, এই কলেজেই অখন্ড ভারতের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের অধিকাংশ শিক্ষা-লাভ করেছিলেন | এখানে আরো অন্যদের মধ্যে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করেছেন জগদীশ চন্দ্র বোস, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ প্রমুখ, বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিকরা |

পরবর্তীকালে, যখন রহমান সাহেব কেমব্রিজে অধ্যয়ন করেন, তখন সেখানে বিশ্বের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা-গবেষণা-কেন্দ্রের পরিবেশ, অসংখ্য গুনী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় ও তাঁদের কারুর কারুর বক্তৃতা শোনা – এই সবই তাঁর বুদ্ধি ও জ্ঞানের দিগন্তকে অনেক বিস্তৃততর করে তোলে | বিশুদ্ধ গণিত, ফলিত গণিত এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর জ্ঞান-লাভের ও গবেষণার স্পৃহা এখানে সৃষ্টি হয়, যা সারা জীবন জাগরুক ছিল | তাঁর পছন্দের সব চেয়ে মেধাবী পন্ডিত যাঁরা, সব চেয়ে বড় প্রতিভার অধিকারী যাঁরা, তাঁদের প্রয়াস সম্বন্ধে অবহিত থাকার চেষ্টা তিনি করতেন এবং অনুরূপ প্রয়াসে অংশ নিতে চাইতেন | ওই সব বিষয় যাঁরা জানতেন, এবং ওই সব প্রয়াসের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করা যাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল, শুধু তাঁরা জানেন বা বুঝতে পেরেছেন রহমান সাবের মূল্য -- গণিতবিদ হিসেবে, গবেষক হিসেবে |

দু-একটা সাধারণ সমস্যার সমাধান করে গবেষণাপত্র রচনা করা ও তা প্রকাশনার মাধ্যমে চাকরি ও সামাজিক জীবনে আরো উঁচু প্রতিষ্ঠা লাভ করার বাসনা তাঁর ছিলনা | সব চেয়ে বড় গণিতবিদদের যে সব সমস্যা পরাস্ত করত, তার কয়েকটি সমাধানের জন্য তিনি অহর্নিশ চেষ্টা করতেন | Theory of Numbers-এর Fermat's Last Theorem নামে পরিচিত সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো একটি সমস্যা তাঁর প্রিয় ছিল | এর দুটি স্বতন্ত্র সমাধান তিনি দিয়েছিলেন, যদিও সফল হননি | এত বছর ধরে পৃথিবীর প্রায় সব বড় গনিতবিদেরাও এই সমস্যার কাছে পরাস্ত হয়ে ছিলেন -- শেষ পর্যন্ত কেমব্রিজের ছাত্র-গবেষক এবং প্রিন্সটনের শিক্ষক-গবেষক গণিতবিদ Andrew Wiles এই সমস্যার পূর্ণ সমাধান দেন | ওঁর প্রমাণে একটি ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ ছিদ্র ছিল, সেটি দূর করার ব্যবস্থা করেন কেমব্রিজে ওঁর গবেষক-ছাত্র Taylor |

Goldbach's Conjecture নামে ওই রকম একটি Number Theory - র পুরনো একটি সমস্যার আজ কেউ সমাধান করতে পারেনি | রহমান সাহেব এই সমস্যা-সমাধানের জন্য অনেক সময় ও শক্তি ব্যয় করেছেন | USA -র Clay Mathematics Institute ওই সমস্যার সমাধানের পুরস্কার হিসেবে এক মিলিয়ন ডলার দেবার অঙ্গীকার করেছে |


রহমান সাহেব Theoretical Physics - এর Quantum Field Theory বিষয়ে পড়াশোনা করে Particle Physics এ গবেষণা করছিলেন | USA র Maryland Universityতে প্রায় একবছর ছিলেন | কোনো তত্ত্বের বিষয়ে ভাসা-ভাসা জেনে কাজ করার পক্ষপাতী তিনি ছিলেননা, গভীরে গিয়ে সব বুঝে, মৌলিক কিছু করার প্রয়াসী ছিলেন | এর ফলে, ভালো ফল পাবার জন্য তাঁকে কঠোর অধ্যাবসায় এবং প্রচুর সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছিল | মুক্তিযুদ্ধে তাঁর আকস্মিক হত্যার ফলে এ বিষয়ে তাঁর সাফল্যের সম্ভাবনা অন্তর্হিত হলো |


শিক্ষক হিসেবে হবিবুর রহমান কেমন ছিলেন প্রশ্ন করলে, সবার কাছ থেকে হয়ত একরকম উত্তর পাওয়া যাবেনা | আমরা যখন পড়তাম,সব চেয়ে উঁচু ক্লাসগুলোয় পড়লেও (তখন অনার্স দু বছরের এবং দু-একটি কলেজে পড়ার ব্যবস্থা ছিল ও M.Sc দু বছরের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ব্যবস্থা ছিল) রহমান সাহেব ক্লাসে পড়া না বলতে পারলে ইস্কুলের মত ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে দিতেন! কেউ যদি বলত, পারব না, উনি বলতেন, পারতেই হবে! এসব শুনে আশ্চর্য লাগতে পারে, ওঁকে খুব ভালো নাও মনে হতে পারে | কিন্তু তাঁর এই কঠোর ভাব একান্ত বাহ্যিক -- ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণের জন্য, তারা যাতে পড়াশোনায় ও নতুন বিষয়ে শেখায় বেশি মনোযোগী হয়, এবং নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করতে শেখে, এই ছিল তার ঐকান্তিক বাসনা | ক্লাসের বাইরে বা তাঁর বাসায় গেলে তিনি খুব মিষ্ট ব্যবহার করতেন | হাসি মুখে নানান খাবার দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করতেন | তবে অঙ্কের ব্যপারে তাঁর কোনো compromise ছিলনা| অঙ্ক আয়ত্ত করার যে কোনো আরামের পথ নেই, সেটা মনে করিয়ে দিতেন | সহজ জনপ্রিয়তার পথে তিনি চলতেন না | ক্লাস-নোট যা দিতেন, তার মান উঁচু ছিল -- বুঝিয়ে দিতেননা, বলতেন, বুঝে নাও নিজে, বলতেন, মাথা খাটাও | নিজে কষ্ট করে, পরিশ্রম করে নোট গুলি তৈরী করতেন -- নতুন বিষয় হলে, একটু সময় নিয়ে নোট তৈরী করতেন | ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্লাসে তাঁর কাছে পাঁচটি বিষয় পড়েছিলাম -- তার দুটি বিশুদ্ধ গণিতের, এবং তিনটি ফলিত গণিতের | সেই জন্য তাঁর শিক্ষকতার বিষয়ে বিশদ জানি |

ক্লাসে পড়ানোর সময় রহমান সাহেব অনেক বিশ্ববিখ্যাত গণিতবিদদের জীবনের কিছু কিছু ঘটনা সম্বন্ধে মাঝে মাঝে সংক্ষেপে বলতেন -- আমাদের অনুপ্রাণিত করতে | উনি অনেক বড় প্রতিভার সান্নিধ্যে এসেছেন, বিশেষ করে কেমব্রিজে | ওখানকার গণিত বিভাগের প্রধান ছিলেন সর্বকালীন সর্বশ্রেষ্ঠদের অন্যতম প্রফেসর পি. এ. এম. ডিরাক | ইনি বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিদ্যার দুই স্তম্ভের অন্যতম Quantum Mechanics বিষয়টির অন্যতম স্রষ্টা, anti-particle তত্ত্বের জনক | এঁর গাণিতিক পান্ডিত্য ও গভীরতা এবং মেধার প্রাখর্যের জন্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ী শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক পদার্থবিদরাও তাঁকে বিশেষ শ্রদ্ধা-সমীহ করে চলতেন | রহমান সাহেব এঁর সম্বন্ধে আমাদের বলতেন এবং ওঁর লেখা বই বেশী অনুসরণ করতেন | এসব অসাধারণ গুনী ব্যক্তিদের বিষয়ে জেনে আমরা আলোকিত বোধ করতাম, জ্ঞানের জগতে কূপমন্ডুক না থাকার তাগিদ বোধ করতাম | এঁদের অনুপ্রেরনায় আমি ব্যক্তিগতভাবে বড় কেউ হতে পারিনি ঠিকই, তবে নিজে কত নগন্য, অন্তত সেটা বোধ করতে শিখেছি |


হবিবুর রহমান সাহেবের জ্ঞান-পিপাসা ও তা চরিতার্থ করার অক্লান্ত প্রয়াস জীবনব্যাপী ছিল | যদিও তিনি অত্যন্ত সামাজিক ছিলেন এবং নিয়মিত সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে যেতেন, রাত্রে খাবার পর অনেকক্ষণ তাঁর নিজস্ব পড়াশুনো চলত | তাঁর বাড়িতে অনেক বিশ্ববিখ্যাত লোকের লেখা বিখ্যাত বই ছিল | এর কয়েকটি ভাবী (মিসেস হবিবুর রহমান) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগকে উপহার দিয়েছিলেন (একটি আলমারি সহ) | দুঃখজনক এই যে গণিত বিভাগের প্রায় কেউ সেসব বই পড়ার চেষ্টা করেননা |

গণিতবিদ, গণিত-শিক্ষক হবিবুর রহমান আবার অসাধারণ সুন্দর সব মানবিক গুনাবলীর আধার ছিলেন | অসাম্প্রদায়িকতা, মানব-হিতৈষণা তাঁর উদার হৃদয়ের ভিন্ন ভিন্ন দিক | তিনি মানবতাবাদী মনীষী মানবেন্দ্রনাথ রায়ের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন | এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি নিয়ে তিনি অনেক কাজ করেছেন | ১৯৬২ সালে রাজশাহীতে ওই ধরণের অবস্থা সৃষ্টির সম্ভাবনা হওয়ায় তাঁর অনুরূপ উদ্যমের প্রস্তুতি ছিল |

১৯৬৯ সালে ডক্টর শামসুজ্জোহা মিলিটারির গুলিতে ও বেয়নেটের আঘাতে নিহত হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে যে সভা আহ্বান করা হয়, সেখানে তত্কালীন সরকারপন্থী একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সরকারী কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে ওই সভায় যোগ দিতে আসেন| জোহা সাহেবের হত্যায় ক্ষুব্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী তাঁকে অপমান করার জন্য ঘিরে ফেলে | তখন হবিবুর রহমান সাহেব তাঁকে মুক্ত করে সভায় তাঁর যাবার ব্যবস্থা করেন | অথচ ওই সরকারপন্থী ভদ্রলোক তারই কিছু দিন আগে রহমান সাহেবের নামে আদালতে অত্যন্ত অপমানজনক অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন | উপরি-উক্ত ঘটনা ওই মামলা চলাকালীন সময়ে ঘটে |

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর হওয়ার মাত্র কয়দিন পরে, ১৯৭১ এর এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে, রাজশাহী শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কিছু দিনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে ছিল | যদিও হবিবুর রহমান সাহেব সক্রিয় ও অকুন্ঠ ভাবে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন ও সহায়তা করেছেন, তবু তিনি কোয়ার্টার ছেড়ে যাননি এবং এসময়ে তাঁর কোনো সহকর্মী পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগিতা করা সত্ত্বেও সেই ব্যক্তিকে তাঁর বাসায় আশ্রয় দিয়ে তত্কালীন মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে রক্ষা করেন | উনি ভেবেছিলেন খুব শীঘ্রই আইনের পথে ব্যক্তিটির সঠিক বিচার হবে, এবং সেইটি-ই ন্যায্য | কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এর কয়দিন পরেই ঢাকা থেকে অনেক পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এসে পড়ায় রাজশাহী তাদের দখলে চলে যায়, মুক্তিযোদ্ধারা সেই সময় সাময়িকভাবে পরাস্ত হয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন | এই সময়ে পাকিস্তানী সৈন্যরা রহমান সাহেবকে তার কোয়ার্টার থেকে ধরে নিয়ে যায়, এবং এর পর তাঁর কোনো হদিস আর পাওয়া যায়নি | সবচেয়ে দুঃখজনক এই যে উপরি-উক্ত সহকর্মী বা তাঁর কোনো বন্ধুবান্ধব রহমান সাহেবকে মুক্ত করার বা তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যকে সাহায্য করার চেষ্টা করেননি | রহমান সাহেবের সহমর্মী মন সহকর্মী বন্ধুদের বিপদকে নিজের বিপদ বলেই মনে করেছেন | সবাই তো এত উদার নয়!

হবিবুর রহমান সাহেবের উদার, নির্মল, কোমল মনের সুন্দর ছবি এই সব ঘটনায় ফুটে ওঠে | আবার তাঁর অসাধারণ চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সত্সাহসের পরিচয় পেয়ে আমরা শ্রদ্ধায় বিনত হই |

No comments:

Post a Comment